ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি, সকাল ৭:৩৫
বাংলা বাংলা English English

মঙ্গলবার, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

৭৫ টাকার ইনজেকশন ৩ হাজারে বিক্রি!


বরগুনার ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ৭৫ টাকার ইনজেকশন তিন হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযুক্ত ওই চিকিৎসকের নাম মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব। তিনি বরিশাল শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব বরগুনার কলেজ রোডের ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে প্রতি মাসে দুইবার রোগী দেখেন। এই চিকিৎসকের আগমন উপলক্ষে বরগুনায় নিয়মিত মাইকিংও করা হয়।

শুক্রবার (১৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় আবদুর রাজ্জাক ও রিয়াজুল ইসলাম নামের দু’জন ভুক্তভোগী সময় নিউজের কাছে সাইনোকর্ট (Cynocort) নামের ৭০ টাকার ইনজেকশন তাদের কাছে তিন হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ করেন। তবে ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইনজেকশনটির দাম ৭৫ টাকা।

যদিও ওই চিকিৎসকের দাবি, ইনজেকশনটির দাম কম। ইনজেকশনটি পুশ করতে তিন হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। আর যদি রোগী গরীব হয়, তাহলে ফ্রিতেও ইনজেকশন পুশ করা হয়।

অভিযোগকারী আবদুর রাজ্জাক বরগুনা সদর উপজেলার লাকুরতলা এলাকার বাসিন্দা। আর অপর অভিযোগকারী রিয়াজুল ইসলাম সদর উপজেলার কুমড়াখালী এলাকার বাসিন্দা।

আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসী ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত। তার মেরুদণ্ড এবং পায়ে ব্যথা। তাই শুক্রবার বিকেল তিনটার দিকে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালে চিকিৎসক মো. শিহাব উদ্দিন শিহাবের কাছে যাই। এরপর ৬০০ টাকা ভিজিট দিয়ে আমার স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। ডাক্তার শিহাব আমার স্ত্রীকে দেখে দুইটি এক্স-রে এবং রক্তের জন্য তিনটি টেস্ট দেন। যার জন্য ব্যয় হয় ১৮০০ টাকা।

‘এরপর রিপোর্ট নিয়ে ফের ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি আমার স্ত্রীকে সাইনোকর্ট (Cynocort) নামের একটি ইনজেকশন পুশ করার কথা বলেন। ইনজেকশনটির দাম তিন হাজার টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুশ করার জন্য কোনো চার্জ দিতে হবে না। পরে আমার কাছে টাকা না থাকায় আমি বাইরে থেকে ইনজেকশনটি কিনে পুশ করতে চাই। এজন্য ইনজেকশনটি নাম লিখে দিতে বললে তিনি রাজি হননি। তাই বিকাশের মাধ্যমে টাকা চান তিনি। পরে আমি বিকাশের মাধ্যমে ডাক্তারের দেওয়া ০১৯১৯১—৬৬৭ এই নম্বরে তিন হাজার টাকা দেই। এরপর ডাক্তার নিজেই আমার স্ত্রীকে ইনজেকশন পুশ করেন।’

তিনি বলেন, পরে আমি ফার্মেসিতে গিয়ে ইনজেকশনটির দাম জেনে অবাক হই। একজন চিকিৎসকের এ কেমন প্রতারণা তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। আমি এর বিচার চাই।

মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে আমি আমার স্ত্রীর বোনকে ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাবের কাছে নিয়ে যাই। এরপর ৬০০ টাকা ভিজিট দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। এরপর তিনি একটি এক্স-রেসহ চারটি টেস্ট দেন। এ টেস্টের জন্য ব্যয় হয় এক হাজার ৭৫০টাকা। পরে বিকেল দুইটার দিকে টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাবের কাছে গেলে আমার স্ত্রীর বোন মোছা. পারভীন আক্তারকে সাইনোকর্ট (Cynocort) নামের ইনজেকশন পুশ করতে হবে বলে জানান। এ ইনজেকশনের দাম জানতে চাইলে তিনি এর দাম তিন হাজার টাকা বলে জানান। পরে আমি নগদ তিন হাজার টাকা দিলে ডাক্তারের টেবিলে থাকা ইনজেকশন ডাক্তার নিজেই পুশ করে দেন। এরপর বাইরে ফার্মেসিতে গিয়ে আমি এই ইনজেকশনের দাম ৭০ টাকা জানতে পারি। একজন ডাক্তার এমন প্রতারণা করতে পারে, তা আমি ভাবতেই পারিনি। আমি এমন প্রতারণার বিচার চাই।’

এদিকে বরগুনা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মী আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, একজন চিকিৎসকের নিজ চেম্বারে ওষুধ বিক্রি করার কথা না। তার উপরে রোগীদের জিম্মি করে ৭৫ টাকা মূল্যের ওষুধ তিন হাজার টাকায় বিক্রি করা অমানবিক এবং অনৈতিক। আমি মনে করি, এমন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

এ বিষয়ে চিকিৎসক মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব মোবাইল ফোনে সময় সময় নিউজকে বলেন, সাইনোকর্ট নামের ইনজেকশনটির দাম কম। বাইরে এটি ৫/৬ শ’ টাকায় পুশ করা হয়। তবে এটি পুশ করতে সিনিয়র চিকিৎসকরা তিন হাজার টাকা থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত নেন। আবার গরীব রোগীদের ফ্রিতেও পুশ করা হয়।

ডক্টরস কেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মো. ইব্রাহীম বলেন, সাইনোকর্ট (Cynocort) নামের ইনজেকশনটির দাম ৭৫ টাকা। এটার দামসহ পুশ করার জন্য ডা. মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব তিন হাজার টাকা নেন। এই ইনজেকশন তার কাছেই থাকে। এই ইনজেকশনের কথা ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করা হয় না। তবে এই টাকার কোনো ভাগ ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ পায় না।

মো. শিহাব উদ্দিন শিহাব একজন সিনিয়র চিকিৎসক। তাই নাম পরিচয় প্রকাশ করে এ বিষয়ে কথা বলতে নারাজ বরগুনায় কর্মরত এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসকরা। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিকিৎসক জানান, এই ইনজেকশন পুশ করার জন্য ঢাকাতেও ৬ শ’ থেকে ৮ শ’ টাকা নেওয়া হয়। সিনিয়র এবং উচ্চ ডিগ্রিধারী চিকিৎসকরাও এ ইনজেকশন পুশ করার জন্য এক হাজার টাকার বেশি নেয় বলে জানা নেই।

আর বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখবো। অভিযোগের যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।