ঢাকা, শুক্রবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৬ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি, দুপুর ১:০১
বাংলা বাংলা English English

দেশে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ল করোনাভাইরাস

গত বছরের মার্চ মাসে দেশে মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষোণা করে সরকার। আর এই সাধারণ ছুটির পরপরই দেশে করোনা ছড়িয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এক গবেষণার বরাতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

দেশি ও বিদেশিসহ সাত প্রতিষ্ঠান ওই গবেষণায় অংশগ্রহণ করে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সাধারণ ছুটির সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের ঢাকা ছেড়ে যাওয়াই দেশব্যাপী করোনাভাইরাসের বিস্তার হয়েছে বলে প্রাথমিক কারণ বের করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যে সাতটি প্রতিষ্ঠান এ গবেষণায় যুক্ত ছিল তারা হলো- সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), আইসিডিডিআরবি, আইদেশি, বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোগ্রাম, যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্যাঙ্গার জিনোমিক ইনস্টিটিউট, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ, এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের বিজ্ঞানীরা।

এসব বিজ্ঞানীর যৌথ উদ্যোগে গত বছরের মার্চ মাসে এই গবেষণাটি শুরু হয়। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রবেশ, বিস্তৃতি এবং এর বিস্তার প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধ এবং জনসাধারণের গতিবিধির ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্লেষণধর্মী গবেষণাটি করা হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর নেচার সাময়িকীতে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় প্রাথমিকভাবে গত বছরের মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ৩৯১টি করোনাভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসের উদ্ভব হয় গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে। পরে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের মাধ্যমে বড় রকমভাবে এ ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চ। বিস্তার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার মার্চ মাসের ২৩ তারিখে ‘২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল’ পর্যন্ত দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোপ্রাম থেকে সংগৃহীত ফেসবুক এবং মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ থেকে ২৬ মার্চের মধ্যে জনসাধারণের ঢাকা ত্যাগ করার প্রাপ্ত ডেটার সঙ্গে সার্স-কোভ-২ জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। এ সময় বিপুল মানুষ ঢাকা ছাড়েন। দেশব্যাপী করোনাভাইরাস বিস্তারের এটিই প্রাথমিক কারণ।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের এই সমন্বিত উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে নীতিনির্ধারকদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকাতে জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ করা, পরিবহন এবং যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা আনা, বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন।

যেসব দেশে উদ্বেগজনক ভেরিয়েন্ট ছিল, সেখান থেকে আগত ভ্রমণকারীদের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা রাখা, সময় মতো লকডাউনের সিদ্ধান্ত বা প্রয়োজনবোধে আন্তর্জাতিক চলাচল সীমাবদ্ধ করার পরামর্শও দেওয়া হয়। আমাদের এই কনসোর্টিয়াম গত বছরের মার্চ মাস থেকে একত্রে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের এই কাজ চলমান। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য কোভিড-১৯ এর বিস্তার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রমাণভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করতে পারব।’

এই গবেষণার মূল লেখকদের একজন লরেন কাউলি বলেন, এ গবেষণায় মহামারি প্রতিরোধে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য মহামারির ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্যাঙ্গার জিনোমিক ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নিকোলাস থমসন বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরেই বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ওপর একসঙ্গে কাজ করছি। বিজ্ঞানীরা যখন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সঙ্গে যৌথভাবে একটি লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করেন, তখন কতটা সাফল্য অর্জন করা যায়, এই গবেষণাপত্রটি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।’

হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথর অধ্যাপক ক্যারোলিন বাকি বলেন, এ ধরনের একটি মিলিত বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে। অন্য কোনো উপায়ে এটা অর্জন করা কঠিন। এ ধরনের গবেষণা শুধু চলমান করোনাভাইরাস মহামারির ক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতের যে কোনো মহামারি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী বলেন, ‘বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন দেশে কয়েক মাস পর মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন ধরন তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ধরন টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার চেষ্টা করছে দেশের সব মানুষকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার। এই টিকাগুলোর কার্যকারিতা বোঝার জন্য আমাদের এ ধরনের কাজ অব্যাহত রেখে সরকারকে সময় মতো সঠিক তথ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে হবে।’

এই গবেষণায় ফেসবুক ডেটা ফর গুড, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি আজিয়াটা লিমিটেড জনসংখ্যা মোবিলিটি তথ্য সরবরাহ করেছে। এছাড়া বিল গেটস এবং মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সার্স-কোভ -২ নমুনার সিকোয়েন্সিংয়ে সহায়তা করেছে।

এদিকে, মহামারি করোনাভাইরাসে গত ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে মারা গেছেন আরও ৩৫ জন। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দেশে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৭ জনে।

মঙ্গলবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ২ হাজার ৭৪ জনের দেহে। এ নিয়ে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪০ জনে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৭৩৫ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৬৬৮ জন। ২৪ ঘণ্টায় ৩১ হাজার ৭২৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।