ঢাকা, শুক্রবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৬ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি, দুপুর ১২:৪২
বাংলা বাংলা English English

হারিয়ে যাচ্ছে ‘হলদে-পা হরিয়াল’

হরিয়াল মূলত কবুতর প্রজাতির এক সুদর্শন বিরল শ্রেণীর পাখি। এদেরকে একসময় প্রায়শই বট কিংবা পিপুল গাছের ডালে বসে থাকতে দেখা গেলেও সে দৃশ্য এখন দুর্লভ। হরিয়ালের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু হওয়ায় এরা শিকারীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। নির্বিচারে হরিয়াল শিকার করায় হারিয়ে যেতে বসেছে দুর্লভ সুদর্শন এই পাখিটি।

নিঃসঙ্গতম প্রকৃতির কবি জীবানানন্দ দাশের বেদিয়া কবিতার দুটি লাইন ছিল- ‘লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ- উষার শ্বাস!/ ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস’। লাইন দুটি পড়ে অনেক কাব্যপ্রেমিকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে হরিয়াল পাখি নিয়ে। একসময় দেশের চিরহরিৎ বনাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে হরিয়াল দেখতে পাওয়া যেত। কেবল বনাঞ্চল নয় গ্রামীণ জনপদেও এদের ছিলো আনাগোনা।

হরিয়ালের গলা, পাখা ও লেজের পালক ঝকঝকে সোনালি রঙের। এদের পা দুটোও সোনালি রঙের হয়ে থাকে। পায়ের তলায় মাংসল গদি থাকে যা বৃক্ষে চলাফেরা করার উপযোগী। হরিয়ালের গায়ের রঙ সাধারণত হলদে, জলপাই ও সবুজ হয়ে থাকে। ছোট হরিয়াল দৈর্ঘ্যে ২৫ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার হয়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারা আলাদা ধাচের। পুরুষ পাখির কপাল ধূসরাভ। মাথা সবুজাভ-হলুদ। ঘাড়ে হালকা ধূসরাভ পট্টি। পিঠ ও ডানা গাঢ় দারুচিনি রঙের। ডানার প্রান্ত পালক হলুদাভ-সবুজ। সঙ্গে কালো খাড়া মোটা টান। সবুজ বুকে ফ্যাকাশে কমলা প্যাঁচ। স্ত্রী পাখির কপালে ও ঘাড়ে ধূসরাভ পট্টি নেই। পিঠ-গাঢ় সবুজ। উভয়ের ঠোঁট সবুজাভ-ধূসর। চোখ হালকা নীলাভ। পা গোলাপি লাল।
সমগ্র বিশ্বে প্রায় ২৩ প্রজাতির হরিয়াল রয়েছে। বাংলাদেশেও বেশ কয়েক প্রজাতির হরিয়াল বিদ্যমান। বাংলাদেশ ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারত, শ্রীলঙ্কা, পূর্ব ফিলিপাইন ও আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে হরিয়াল পাখি দেখতে পাওয়া যায়। এদের প্রিয় খাবার বট ফল এবং ডুমুর। একসময় পথের প্রান্তে বটগাছের উঁচু ডালে সাত সকালে দল বেধে এই পাখিগুলোকে রোদ পোহাতে দেখা গেলেও, এ দৃশ্য এখন বিরল।
শীতকাল মূলত হরিয়ালের প্রজনন সময়। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে একটি মেয়ে হরিয়াল নিজেদের তৈরি পত্র-পল্লবে ঘেরা বাসায় মাত্র দুটি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা হতে সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ দিন সময় লেগে যায়।
এককালে সারা দেশ জুড়ে হরিয়াল দেখা গেলেও এখন কেবল পাহাড়ি ঘন বনাঞ্চলে হরিয়াল দেখতে পাওয়া যায়। নির্বিচারে পাখি শিকার এবং বনাঞ্চল উজাড় করে দেওয়া হরিয়াল এখন বিলুপ্তির পথে। বাংলা প্রবাদ- ‘আপনা মাংসে বৈরি হরিণী’ হরিয়ালের সাথে খাপে খাপ মিলে যায়। এখনই যদি এই পাখিটির জন্য একটি নিরাপদ অভয়ারণ্যের ব্যবস্থা না করা যায় তো অচিরেই বাংলাদেশ থেকে হরিয়াল সম্পূর্ণ রূপে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।