ঢাকা, বুধবার, ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি, দুপুর ১২:২১

ঈদে রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে আনন্দ, বাংলাদেশের জন্য প্রার্থনা

করোনা মহামারির মাঝেও মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন। কোনো ধরনের ঈদ আনন্দের কমতি নেই তাদের।

বুধবার (২১ জুলাই) সকাল সাড়ে ৭টায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে একযোগে ঈদের নামাজ আদায় করেন তারা।

নামাজ শেষে মোনাজাতে দ্রুত নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত ও বাংলাদেশের প্রতি শুকরিয়া জানান রোহিঙ্গারা। পর্যাপ্ত কোরবানির পশু না পেলেও সরকার সব ধরনের উদ্যোগে নেওয়ায় রোহিঙ্গারা স্বস্তিতে ঈদুল আজহা উদযাপন করছে বলে জানিয়েছে ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে দেখা যায়, সকালেই ক্যাম্পের বসতি থেকে নতুন জামা-কাপড় ও মাথায় টুপি পরে বের হচ্ছেন রোহিঙ্গারা। সবার উদ্দেশ্য ঈদুল আজহার নামাজ আদায়। ঠিক যখন সকাল সাড়ে ৭ টা, উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে দু’হাজারের বেশি অস্থায়ী মসজিদে একযোগে শুরু হয় ঈদুল আজহার জামাত।
এরপর নামাজ আদায় শেষে দু’হাত তুলে মোনাজাতে দ্রুত স্বদেশে ফেরত, নির্যাতনের বিচার ও বাংলাদেশকে প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপন করেন রোহিঙ্গারা।
কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইদ্রিস বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের জন্য বেশি দোয়া করেছি। এছাড়া নিজেদের সম্মান ও অধিকার নিয়ে স্বদেশে ফিরতে পারি এবং বিশ্ববাসীকে যে বিচার দেওয়া হয়েছে, যারা আমাদের নির্যাতন করেছে তাদের যাতে শাস্তি হয় আল্লাহর কাছে এটাই দোয়া করেছি।

আরেক রোহিঙ্গা কলিমুল্লাহ বলেন, করোনার মহামারি থেকে মুক্তির জন্য দোয়া প্রার্থনা করেছি। পাশাপাশি নিজ দেশে ফিরতে আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে প্রার্থনা করেছি।
আশরাফ আলী নামে এক রোহিঙ্গা বলেন, পবিত্র ঈদের দিনে পুরো বিশ্বের মুসলিমদের জন্য দোয়া চেয়েছি। আমাদের দেশে ফিরতে পারি সেটা আল্লাহর কাছে চেয়েছি। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আয়ু বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেছি।
ক্যাম্প ২ ইস্ট ব্লকের রোহিঙ্গা আয়াছ বলেন, আবার কিভাবে নিজের দেশে স্বাধীনভাবে ফিরতে পারবে এবং মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে যাতে নাগরিকত্ব পায় ঈদের দিনে সবাই মিলে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে এটাই চেয়েছি।
এরপর মসজিদ থেকে বের হয়ে সবাই ঘরে প্রবেশ করে। কিছুক্ষণ পর সবাই আবার দা-ছুরি নিয়ে বের হয়ে নির্দিষ্ট পশু কোরবানির স্থানে যায়। তারপর শুরু হয় প্রতিটি ব্লকে পশু কোরবানি ও মাংসের ভাগবাটোয়ারা। তারপর প্রতিটি বসতিতে বিতরণ করা হয় কোরবানির মাংস। সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে পশু কোরবানি করতে পারায় দারুণ খুশি রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গা নারী ইসছত বলেন, আমরা মাংস পেয়েছি আল্লাহর রহমতে। ক্যাম্পে মাঝিরা আমাদের মাংস দিয়েছে। শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
আরেক নারী রহিমা বলেন, কোরবানির সময় মাংস পাব এটা আশা করিনি। কিন্তু এখন মাংস পেয়েছি শোকরিয়া জানাই। এখন ছেলে-মেয়েরা সবাই কোরবানির মাংস খেতে পারবে। তাই বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানা়ই।
কুতুপালং ক্যাম্পে সেক্রেটারি মোহাম্মদ নুর বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে থেকে ক্যাম্প ২ ইষ্টে ২৮টি গরু কোরবানি হয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া অসহায় রোহিঙ্গা নাগরিক আমরা। কোরবানি করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ক্যাম্প ইনচার্জ ২৮টি গরু দিয়েছে, মাঝিদের মাধ্যমে তা ভাগবাটোয়ারা করে অসহায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঈদকে ঘিরে ক্যাম্পের প্রতিটি ব্লকে রয়েছে শিশুদের মাঝে আনন্দের বন্যা। শিশুরা নাগরদোলা, খাওয়া-দাওয়া ও ঘোরাঘুরিতে মেতে উঠেছে।
রোহিঙ্গা শিশু রহিম জানায়, বন্ধুরা সবাই মিলে দোলনায় মজা করেছি। খাবার খেয়েছি, এখন বন্ধুরা সবাই মিলে ঘোরাঘুরি করছি। এরপর আবারও দোলনায় দুলবো।
আরেক রোহিঙ্গা শিশু তৈয়ব বলেন, বন্ধু-বান্ধবরা ঘোরাঘুরি করছি, নাস্তা করছি, মজা লাগছে।
লায়লা নামে আরেক শিশু জানায়, আজকে ঈদের দিন, নতুন জামা পরেছি। বেশি খুশি লাগছে, সবাই মিলে মজা করছি।
কুতুপালং ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, এবার করোনা মহামারির কারণে কোরবানির পশুর সংকট ছিল ক্যাম্পে। অনেক দাতা সংস্থাও রোহিঙ্গাদের জন্য গরু বা ছাগল দেয়নি। কিন্তু তারপরও সরকারি নানা পদক্ষেপের কারণে করোনার মাঝে স্বস্তিতে ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন রোহিঙ্গারা।
তিনি বলেন, সবাই যাতে কোরবানির মাংস পায় তারও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবকিছু মিলিয়ে রোহিঙ্গা নামাজ আদায় শেষে কোরবানিতে মেতে উঠেছে। আর কোরবানির বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছে। দ্রুত বর্জ্য পরিষ্কার করা হবে।
অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. সামছু-দ্দৌজা বলেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কোরবানির জন্য ব্যবস্থা করা হয় প্রায় ৩ হাজার গরু ও ছাগল। যার ফলে রোহিঙ্গারা আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করছে।