সোমবার, ২৫শে জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, সকাল ৯:২৫

সাংবাদিক রাহাত খানের প্রভাবে বরিশাল ডিবি কার্যালয় থেকে মাদক বিক্রেতার মুক্তি

সাকিব বিপ্লব।।

এক মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীকে তার বাসা থেকে ৪০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের তিন ঘণ্টার মাথায় ছেড়ে দিলো বরিশাল মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। বিপরিতে তার সাথে আটক মনোজকে মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তি পাওয়া যুবক সোহাগ ও মনোজ সম্পর্কে চাচাতো ভাই। সোহাগের আপন বড় ভাই রাহাত খান বেরকারি টিভি চ্যানেল24 এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন এর সাংবাদিক হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে ডিবির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির শর্তে ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয় বলে জানা গেছে। এনিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অবধি ডিবি কার্যালয়ে চলে নাটকীয়তা। একাধিক সূত্র ও প্রত্যাক্ষদর্শীদের কাছ থেকে তথ্য প্রাপ্ত।

এ এঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গোটা বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে ডিবি কর্মকর্তাদের অতিউৎসাহী ভুমিকা এবং এ সংক্রান্তে মিডিয়াকর্মীদের কাছে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এলোমেলো বক্তব্য দেয়। এক পর্যায়ে সংবাদর্মীদের প্রশ্নের চাপের মুখে স্বীকার করেন আটক যুবক সোহাগের কাছে নয়, সঙ্গী মনোজের কাছে ১০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। কিন্তু ডিবি পুলিশের এই বক্তব্যের সাথে প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্বিমত পোষন করেছে । তাদের অভিযোগ সোহাগ চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তার অপর এক ভাইও একই পথের পথিক।

যারা ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন এমন কয়েকজন ব্যক্তির অভিমত হচ্ছে, উদ্ধার ইয়াবার পরিমাণ আরও বেশি। আটক অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ডিবির পরিদর্শক কমলেশ হালদার জানান, ঘটনার দিন সন্ধায় কোন এক মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে সাগরদী সিকদারপাড়া এলাকায় সোহাগের বাসায় অভিযান চালান। এসময় গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সোহাগ ও মনোজসহ অপর এক যুবক পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তিনজনকেই আটক করতে সক্ষম হয়।

ওসি কমলেশের প্রাথমিক ভাষ্য ছিল, আটক তিনজনের মধ্যে প্রধান সোহাগ আগন্তক এক যুবকের কাছে ইয়াবা বিক্রির দেনদরবার শেষে সেবনের আয়োজন করছিলো। তখন রাতের আধার সবে নামছিল। আটক তিনজনের মধ্যেকার আগন্তক যুবককে ঘটনাস্থলেই ছেড়ে দিয়ে সোহাগ ও মনোজকে সিঅ্যান্ডবি রোডে স্থানান্তরিত নতুন গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়।

গোয়েন্দা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, খবর পেয়ে ঘটনার পরপরই সোহাগের বড় ভাই একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও তাদের একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিনিধি যুববয়সী এই সংবাদ কর্মী তার অনুসারী কয়েকজনকে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ওসি কমলেশ হালদারের কাছে ইজ্জত রক্ষার দাবি জানিয়ে আটক দুই সহোদরকে ছেড়ে দেওয়ার বায়না ধরেন। প্রভাবশালী মিডিয়া হাউজে কর্মরত ওই মিডিয়াকর্মীর আবদার কীভাবে পুরণ করা যায় তা নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের দুইজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে পৃথক বৈঠকে বসেন।

অন্যদিকে জনপ্রিয় আরেকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের বরিশাল প্রতিনিধি, যার সাথে ডিবি পুলিশেল সখ্যতা রয়েছে সেই মিডিয়াকর্মী ভাইয়ের ঘটনাটি ইতিবাচক সমাধানে অনুরোধ রেখে তার সহকর্মীর সম্মান রক্ষার অনুরোধ রাখেন। এর প্রেক্ষাপটে পরে সম্মিলিতভাবে ডিবির দুই শীর্ষ কর্মকর্তাসহ কমলেশ হালদার আটক সোহাগকে রক্ষা উপায় বের করে। সেক্ষেত্রে চাচাতো ভাই মনোজের কাছে ইয়াবা পাওয়া গেছে, সাথে ছিল সোহাগ এমন কাহিনী সাজানো হয়। ছেড়ে দেওয়ার একপর্যায়ে শর্তস্বরুপ সোহাগকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানেও রয়েছে নাটকীয়তা।

কারণ আলোর পথে আসার সুযোগ দেওয়ার ধুয়া তুলে পরবর্তী পরিস্থিতি যেন সামাল দেওয়া যায়, সেই কৌশল এটে গোয়েন্দা পুলিশ বিতর্ক এড়াতে অবস্থান নিয়েছে। রাত ৯টার পরে সোহাগকে গোয়েন্দা দপ্তর থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ততক্ষণে স্থানীয় মিডিয়াঙ্গনে এই ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ডিবি পুলিশের কাছে মাদক বিক্রেতাকে ছেড়ে দেওয়ার হেতু কী জানতে চেয়ে ফোন আসায় এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে যানাগেছে গোয়েন্দা দপ্তরের একাধিক সূত্র এমনটি আভাস দিয়েছে।

একটি অসমর্থিত সূত্র জানায়, মিডিয়াকর্মীরা যেন পরদিন এই ঘটনাকে কেন্দ্র কোন উদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সম্মিলিত ভাবে একই বক্তব্য দেওয়ার সিন্ধান্ত নিয়ে আগে ভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। ঘটেছেও তাই। পরদিন আজ বুধবার সকালে অপরাপর মিডিয়াকর্মীরা এই বিষয়ে জানতে চেয়ে অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ওসি কমলেশ হালাদারের কাছে প্রশ্ন রাখলে তিনি জানান, সোহাগ মাদক বিক্রেতা নয়, সেবনকারী। এই বক্তব্যে তিনি নিজেই ফেঁসে যান। কারণ আটকের পরপরই মাঠ পর্যায়ের এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন সোহাগ ও মনোজের স্বীকারোক্তি মোতাবেক উদ্ধার ইয়াবার কিছু অংশ তাদের ঘরে পাওয়া যায়। বাকি অংশ তাদের কাছেই ছিলো।

এই অভিযানের সময় স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হয়ে গোটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করে এবং ৪০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে সে সময় অভিযানে অংশ নেওয়া গোয়েন্দা সদস্যরা স্বীকার করে। অথচ সেই গোয়েন্দা কর্মকর্তা কমলেশ হাওলাদার রাত পোহানোর পরদিন ভোল পাল্টে ফেলেন। এখন তার বক্তব্য হচ্ছে, ৪০ পিস নয়, ১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। যার মালিক মনোজ। কেন তাহলে সোহাগকে আটক করা হল? এর উত্তর দিতে গিয়ে তিনি জানান, সেবনকারী হিসেবে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এবং মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ছিল।

এখন প্রশ্ন উঠেছে ইয়াবা বিক্রেতা বা সেবনকারীকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানোর দায়িত্ব কী ডিবি পুলিশের? এনিয়ে উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি/ডিসি) মনজুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করে এই প্রসঙ্গ তুলতেই তাৎক্ষনিক তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন কোন পত্রিকা থেকে ফোন করা হয়েছে। স্থানীয় একটি পত্রিকার পরিচয় দেওয়া মাত্র তিনি জানান জরুরি বৈঠকে বসেছেন, সুতরাং এখন এই বিষয়ে কথা বলার সময় নেই জানিয়ে তার কার্যালয়ে আসার অনুরোধ রাখেন।

পরবর্তীতে ওসি কমলেশ হালদারের টিম পরিচালনাকারী অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি/ডিবি) রেজাউল করিম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও প্রাসঙ্গকি বিষয় নিয়ে কথা বলতে অস্বিকৃতি জানান। , এবং তিনিও এড়িয়ে যেতে জরুরি বৈঠকে রয়েছে বলে ব্যস্ততার অযুহাত দাড় করান।